সোমবার, জুন ২৭, ২০২২
The Report
অত্যন্তদূরদর্শী ও বিচক্ষণ রাজনীতির ধারক আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু

অত্যন্তদূরদর্শী ও বিচক্ষণ রাজনীতির ধারক আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু

টিএনএন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : November 03, 2021 | খোলা কলম

খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হবার পাশাপাশি শুধুমাত্র রাজনীতিতেই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্পায়নের মাধ্যমেও দেশের ও গণ মানুষের জন্য কাজ করে নিজেকে উৎসর্গ করা সম্ভব। বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম অন্তরায় বেকারত্ব। দেশের বেকারত্ব হ্রাস করতে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরীতে সহায়তা করেছেন তিনি, যা একটু খানি কথা না! আর তার জন্য প্রয়োজন ত্যাগ, প্রত্যয় ও সংগ্রাম। আর তিনি তাঁর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আমাদেরকে করেছেন ঋণী। যার কথা বলছি তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের অভিভাবক সফল ব্যবসায়ী ও শিল্পদ্যোক্তা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। ২০২১ সালে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে স্বাধীনতা পদক (মরণোত্তর) অর্জন করেছেন।

 

চট্টগ্রামের খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু নানা ঝামেলার মাঝেও দলীয় আদর্শে তিনি ছিলেন দৃঢ়। দলীয় নেতা কর্মীদের নিকট হয়ে উঠেছিলেন বড় অবলম্বন। রাজনীতিসহ ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্পায়নের মাধ্যমেও দেশের মাটি ও মানুষের জন্য কাজ করেছেন তিনি। দেশের বেকারত্ব হ্রাসে সহায়তা করেছেন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বহু বছর ধরে সক্রিয় ছিলেন। তিনি দীর্ঘ একটি সময় ধরে দণি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ছিলেন। আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে চার বার নির্বাচিত হয়েছেন। নবম জাতীয় সংসদে তিনি পাট বস্ত্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন। ১৯৪৫ সালে হাইলধর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন আখতারুজ্জামান চৌধুলী বাবু। তাঁর পিতার নাম নুরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি ছিলেন একজন আইনজীবী এবং জমিদার। তাঁর মাতার নাম খোরশেদা বেগম। তিনি বাংলাদেশের সনামধন্য শিল্পপতি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর উপজেলার মরহুম আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর দ্বিতীয় কন্যা নুর নাহার জামান এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৩ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তানের জনক।

 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ১৯৫৮ সালে পটিয়া হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন । একই বছরে ঢাকা নটরডেম কলেজে ভর্তি হন। ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে পড়ার সময় তিনি বৃত্তি পেয়ে আমেরিকার ইলিনয় ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে ভর্তি হন। এরপর তিনি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে বিজসেন এডমিনিষ্ট্রেশনে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে এসোসিয়েট ডিগ্রি নিয়ে ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরেন। ১৯৬৫ সালে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৫৮ সালে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সালে তিনি মূল সংগঠন আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়া থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হন। আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ছিলেন ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে অসহযোগ আন্দোলনের সময় সংগ্রাম কমিটির কর্মকান্ড পরিচালিত হ্ত তাঁর পাথরঘাটাস্থ জুপিটার হাউজ থেকে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা চট্টগ্রামের আসার পর জুপিটার হাউস থেকে সাইকোস্টাইল করে প্রচার করা হয়। তাঁর বাসা থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রসহ সব জায়গায় পাঠানো হয়। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারতে যান এবং সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন বিশ্বজনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে। তিনি প্রথমে লন্ডনে যান, সেখান থেকে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে আমেরিকায় যান। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমপিএ) হিসেবে আখতারুজ্জামান চৌধুরী ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদের সদস্য হন এবং বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ণে ভুমিকা রাখেন। পরে ১৯৮৬, ১৯৯১ এবং ২০০৮ সালে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

 

দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু স্বাধীনতার পর। তিনি বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু খুন হবার পর আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং পরবর্তীতে দলের পুনরাবৃত্তি ও পুর্নগঠনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বলিষ্ট ভূমিকা রাখেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি কারা নির্যাতন ভোগ করেন। রাজনীতিবিদসহ আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু একজন সফল ব্যবসায়ী ও শিল্পদ্যোক্তা ছিলেন। স্বাধীনতার আগে তিনি বাটালি রোডে রয়েল ইন্ডাষ্ট্রি নামে একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আসিফ ষ্টিল মিল, জাভেদ ষ্টিল মিল, আসিফ সিনথেটিক, প্যানাম বনস্পতি, আফরোজা অয়েল মিল, বেঙ্গল সিনথেটিক প্রোডাক্ট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। ভ্যানগার্ড় ষ্টিল মিল, সিথেটিক রেজিন প্রোডাক্ট ক্রয় তিনি বিদেশি মালিকানাধীন আরমিট মিল ক্রয় করে সেটিকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করান। তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন বাংলাদেশ বেসরকারি ব্যাংকিং সেক্টর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। তিনি দেশের দ্বিতীয় প্রাইভেট ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল) এর উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তিনি ২০১১ সালে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু দেশের ব্যবসায়ী সমাজের মুখপাত্র ও ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি দু’দফায় চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৮৮ সালে তিনি দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠক এফবিসিসিআই-এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ওআইসিভুক্ত দেশসমূহের চেম্বারের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি ৭৭ জাতি গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশী যিনি এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু একজন সমাজহিতৈষী, দানবীর ও জনদরদী ছিলেন। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি হাইলধর ইউনিয়নর পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। স্বাধীনতার পরেও তিনি হাইলধর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং থানা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। আনোয়ারা ডিগ্রী কলেজ, যোগেশ চন্দ্র মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, হাইলধর বীশরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়, বরুমচড়া, বশরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয় ও ঝিবাশি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাসহ বটতলী মোহছেন আউলিয়া ডিগ্রী কলেজ, চন্দনাইশ বরমা কলেজ, এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ, এ.জে.চৌধুরী ডিগ্রী কলেজ, রায়পুর উপকূলীয় উচ্চ বিদ্যালয়সহ আনোয়ারা পশ্চিম পটিয়ার ও চট্টগ্রামে অনেক স্কুল কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদাতা সদস্য। এছাড়াও বহু জনহিতকর কাজের সাথে জড়িত ছিলেন তিনি।

 

আমি সৌভাগ্যবান, ধন্য আমার জীবন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মত এত বড় মাপের মহৎ হৃদয়বান জাতীয় নেতার সহচার্য লাভের সুযোগ হয়েছে। বিশ্বস্ততার সহিত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত— তাঁর অভিভাবকত্বে তাঁর সহিত রাষ্ট্রের সেবামূলক কাজ করেছি এবং তাঁর সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। তাঁকে কাছ দেখেছি, মিশেছি। সুখ, দুঃখের সঙ্গী হয়েছি। আমি দেখেছি, তাঁর মধ্যে এক নরম প্রকৃতির হৃদয়, মানুষকে ভালবাসার উদার মন-মানসিকতা। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু সমস্ত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে নির্মাণের সম্মুখ সৈনিক ছিলেন। তিনি স্বাধীনতা উত্তর কালের সেই সব বিরল রাজনীতিবিদে অন্যতম যারা আওয়ামীলীগের দুঃসময়ে হাল ধরেছেন, রাজনীতি করেছেন নিজের অর্থ ব্যয়, বর্ষিয়ান আওয়ামীলীগ নেতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ছিল এমনি এক অসাধারণ মহাপুরুষ। যার সঙ্গে সঙ্গে চলে গেছে বিশাল এক প্রাণবন্ত জগত। তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে সংগঠন ও জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন।

 

লেখকঃ বোরহানউদ্দিন চৌধুরী মুরাদ