সোমবার, জুন ২৭, ২০২২
The Report
ছোট বোনের স্মৃতিচারণায় অজানা এক কাজী আনোয়ার হোসেন
বাবা কাজী মোতাহার হোসেনের (ইনসেটে) অনুপ্রেরণায় লিখেছিলেন ‘কুয়াশা’

ছোট বোনের স্মৃতিচারণায় অজানা এক কাজী আনোয়ার হোসেন

টিএনএন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : January 20, 2022 | খোলা কলম

এই অঞ্চলের নাবালক রোমাঞ্চ সাহিত্যকে একাই সাবালক করে তুলেছিলেন তিনি। তাঁর উদ্যোগেই বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদি সাহিত্যগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল এ দেশের অগণিত কিশোর ও তরুণ। নবীন পাঠক তৈরিতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেবা প্রকাশনীর জুড়ি মেলা ভার। তবে তাঁর ছোট বোন মাহমুদা খাতুনের স্মৃতিচারণায় উঠে এলেন অজানা এক কাজী আনোয়ার হোসেন...

আমরা ছিলাম ১১ ভাইবোন। মা-বাবার প্রথম সন্তান ছিলেন যোবায়দা মির্যা। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯২৩ সালে। আমার পাক্কা ২০ বছর আগে। তিনি ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর শেষ কর্মস্থল ছিল ঢাকা কলেজ, ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে। তারপর মেজ বোন ওবায়দা সাদ। তিনি কয়েকটি স্কুলে হেড মিস্ট্রেস হিসেবে দায়িত্ব পালন করে কর্মজীবন শেষ করেন ময়মনসিংহ ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে। এরপর আমার সবচেয়ে বড় ভাই কাজী ইকবাল হোসেন। তিনি ছিলেন খেলার পাগল। ম্যাট্রিক পরীক্ষার কিছু আগে একদিন ফুটবল খেলছিলেন। হঠাৎ জোরে তাঁর বুকে এসে বল লাগে। ওই আঘাতে ফুসফুস ফেটে তাঁর মৃত্যু হয়।

এরপর আমার সেজ বোন খুরশীদা খাতুন। বিয়ের মাত্র বছর দেড়েক পরেই তিনি মারা যান। এরপর আমার ন বোন যাহেদা হক। তিনি বিএ পাস করার পর বিয়ে করে সংসার–ধর্ম পালন করেন। এরপর আমার রাঙা বোন সন্‌জীদা খাতুন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স করে শান্তিনিকেতন থেকে এমএ পাস করে স্বর্ণপদক লাভ করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন। ছায়ানটের তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এরপর আমার মেজ ভাই কাজী সুলতান হোসেন। তিনি আর সেজ ভাই কাজী আনোয়ার হোসেন বেশ ছোটবেলায় পুকুরে নেমে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন, কে কত বেশিক্ষণ পানিতে ডুবে থাকতে পারেন।

প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে তাঁরা দুজনই পানিতে ডুবে যান। আনোয়ার ভাইকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও সুলতান ভাইকে পাওয়ার আগেই তিনি মারা যান সেজ ভাই কাজী আনোয়ার হোসেন, যাঁকে আমি বড়দা বলেই ডাকি, তাঁকে আর নতুন করে পরিচয় করে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তিনি আইএ পড়ার সময় কুয়াশা সিরিজের দুটি রহস্য উপন্যাস লিখে বাবাকে পড়তে দেন। খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন বাবা। পাস করার পর বড়দা সে কথা মনে করে স্থির করলেন, রহস্য উপন্যাসই লিখবেন, তখন থেকে আমৃত্যু লিখেই গেছেন।

এরপর আমার ছোট ভাই কাজী মাহাবুব হোসেন। তিনি যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু দেশে তাঁর উপযোগী কাজ না থাকায় বড়দা আনোয়ার হোসেনের সঙ্গেই সেবা প্রকাশনীতে লেগে পড়েন। তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল ওয়েস্টার্ন কাহিনি। সেগুলো অনুবাদ করে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পরে তাঁর কিডনিতে সমস্যা ধরা পড়ে। তাতেই তিনি মারা যান। এরপর আমার ফুল বোন ফাহমিদা খাতুন। তিনি প্রাণিবিদ্যায় এমএ করে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতেন, এখন অবসরে আছেন। আর সব শেষে এই আমি। আমরা এগারো জন ভাইবোন হলেও ইকবাল ভাই আর সুলতান ভাই মারা গিয়েছিলেন আমারও জন্মের আগে। তাই আমরা এগারো জন কখনো একসঙ্গে ছিলাম না।

আমার বড়দা কাজী আনোয়ার হোসেন ছিলেন একদম অন্য রকম। ছোটবেলা থেকেই পাড়ার বা বাইরের ছেলেদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করতেন। বাইরের জগৎ তাঁকে এতটাই টানত যে স্কুলে পড়ার সময়ই কয়েকবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন। সাধারণত, কয়েকজন বন্ধু জুটিয়ে অজানা জায়গায় অ্যাডভেঞ্চার করতে বেরিয়ে যেতেন। কখনো পাহাড়ে, কখনো সাগরতীরে, কখনো বনে। ৩–৪ দিন ঘুরে বেড়িয়ে আবার নিজেই ফিরে আসতেন। প্রথম প্রথম বাড়ির সবাই খুব চিন্তা করত। তারপর সবাই বুঝে গেল আনোয়ার ভাইয়ের স্বভাবটাই এ রকম, খুব শাসনে বেঁধে রাখা যাবে না। বড়দার এসব অ্যাডভেঞ্চারলব্ধ অভিজ্ঞতার কিছু ছোঁয়া তাঁর পরবর্তীকালের লেখার ভেতরে পাওয়া যায়। বড় হওয়ার পর তাঁর দুটি বিষয়ে প্রবল আগ্রহ জন্মে। একটি হলো বাঁশি বাজানো। গভীর রাতে বড়দা যখন বাঁশি বাজাতেন, তার সুর পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে অদ্ভুত এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করত। বড়দার দ্বিতীয় শখ ছিল কবুতর পালন। এক সময় বাড়ির ছাদে শত শত কবুতর ছিল। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল সব কবুতর মরে পড়ে আছে। সম্ভবত বিড়াল কিংবা বেজিজাতীয় কোনো প্রাণী সেগুলো মেরে ফেলেছিল। ছাদ জুড়ে কবুতরের ছিন্নভিন্ন শরীর আর রক্ত। এ ঘটনা বড়দাকে প্রবলভাবে আঘাত করেছিল। এরপর তিনি আর কখনো কবুতর পালেননি।

এমএ পাস করার পর সবাই যখন চাকরি খুঁজছেন, বড়দা তখন চুপচাপ বসে রইলেন। আসলে কারও অধীনে চাকরি করা তাঁর পছন্দ ছিল না। কিন্তু সবাই যখন চাকরি আর উপার্জনের কথা বলতে শুরু করলেন, ঠিক করলেন চা-বিস্কুটের দোকান দেবেন। বাড়ির বাইরের দিকে এক কোণে একটি ঘর খালি পড়ে থাকত। তিনি সেখানে ‘বৈশাখী’ নামে চায়ের দোকান খুলে বসলেন। ওই দোকানে কতটুকু বিক্রিবাট্টা হতো আর বড়দা কাজটা কতটা পছন্দ করতেন জানি না, তবে কিছু দিন পর একদিন বাবা (কাজী মোতাহার হোসেন) তাঁর দোকানে গেলেন। বড়দাকে বললেন, ‘নবাব (বড়দার ডাকনাম), তুই যে আইএ পড়ার সময় দুটি গল্প লিখেছিলি, সেগুলো খুবই ভালো হয়েছিল। তুই সেগুলো নিয়ে ভেবে দেখতে পারিস। এখন থেকে তুই বরং রহস্য গল্পই লিখতে শুরু কর।’ বাবার অনুপ্রেরণায় বড়দার জীবন বদলে গেল। তিনি তাঁর গল্প দুটি দিয়ে নতুন একটি সিরিজ শুরু করলেন, নাম ‘কুয়াশা’। তার পরের ইতিহাস তো কমবেশি সবারই জানা।

বড়দার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চার ভাই–ই গত হলেন। সাত বোনের মধ্যে এখন সন্‌জীদা আপা, ফাহমিদা আপা আর আমি জীবিত। আমাদেরও বয়স হয়েছে। আর কত দিন আমরা একসঙ্গে থাকতে পারব জানি না। তবে ফেলে আসা দিনগুলো আমাদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে। মাহমুদা খাতুন: নকশাবিদ ও কাজী আনোয়ার হোসেনের ছোট বোন