শনিবার, ডিসেম্বর ৩, ২০২২
The Report
দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে পদ্মাসেতু উদ্বোধনের দিন বিয়ে

দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে পদ্মাসেতু উদ্বোধনের দিন বিয়ে

সাইফুল সামিন, ঢাকা
প্রকাশের সময় : June 24, 2022 | খোলা কলম

হাসান মাহমুদের বাড়ি সাভার। সারজিনা হোসাঈন তৃমার গোপালগঞ্জ। দুই এলাকার মধ্যে যোগাযোগে বড় বাধা প্রমত্তা পদ্মা। কিন্তু এই বাধা আর থাকছে না। 

দুদিন বাদেই পদ্মাসেতু চালু হচ্ছে। তখন চাইলেই এই পদ্মাসেতু দিয়ে নির্বিঘ্নে যাওয়া-আসা করা যাবে। 

এখন সবার চোখ পদ্মাসেতু উদ্বোধনের দিন গণনার দিকে। হাসান ও তৃমার দিন গণনা অবশ্য অনেক আগেই শুরু হয়েছে। এই দিনটির জন্য তাঁরা আসলে আকুল নয়নে অপেক্ষা করছেন।

হাসান-তৃমার এমন অপেক্ষার পটভূমি জানতে ফিরে যেতে হবে বছর দশেক আগে। তখন দুজনের মধ্যে পরিচয়-জানাশোনার পর মন দেওয়া-নেওয়া হয়।

সম্পর্কের এক পর্যায়ে হাসান মজা করে তৃমাকে বলেছিলেন, ফেরিতে করে পদ্মা পাড়ি দিয়ে বিয়ে করাটা কঠিনই হয়ে যাবে। 

তারপর হাসান-তৃমার চোখের সামনে পদ্মার বুকে গড়ে উঠতে থাকে স্বপ্নের সেতু। একের পর এক যখন স্প্যান বসানো হচ্ছিল, তখনই হাসানের মাথায় একটা দারুণ আইডিয়া আসে। তৃমার সঙ্গে এই আইডিয়া শেয়ার করেন হাসান। তৃমাও রাজি হয়ে যান। 

হাসান-তৃমার সম্পর্কের কথা উভয় পরিবার জানত। কবে তাঁরা বিয়ে করবেন, সে বিষয়ে উভয় পরিবারের সদস্যরা তাড়া দিচ্ছিল।

কবে বিয়ে করবেন, সেই পরিকল্পনার কথা হাসান ও তৃমা নিজ নিজ পরিবারকে জানায়। অদ্ভুত এই পরিকল্পনা শুনে উভয়ের পরিবার ‘ভোটো’ দেয়।

হাসান বলেন, ‘অভিভাবকদের চাপ সত্বেও আমি আমার পরিকল্পনায় অটল থাকি। বলা যায়, বিয়েটা ঠেকিয়ে রাখতে হয়েছে। আমাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল তৃমা।’

তৃমা বলেন, ‘আমরা দুজনেই একটা কথা ভেবেছি। আমরা একটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছি। তাই আমরা আমাদের বিয়েটা স্মরণীয় করে রাখার পরিকল্পনায় স্থির ছিলাম।’

২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর সর্বশেষ স্প্যান বসানো হয়। এই স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে পদ্মার দুই পাড় যুক্ত হয়ে যায়। হাসান-তৃমা জুটির চোখে-মুখে বয়ে যায় খুশির ঝিলিক। এবার দুজনের জীবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করার পালা। পারিবারিক পর্যায়ের আনুষ্ঠানিকতাগুলো ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। 

গত ২৪ মে আসে বহুল কাঙ্ক্ষিত সেই ঘোষণা। ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মাসেতু উদ্বোধন করবেন। এই ঘোষণাতেই হাসান-তৃমার বিয়ের দিন ঠিক হয়ে যায়।

পদ্মাসেতু উদ্বোধনে চলে জোর প্রস্তুতি। হাসান-তৃমার বিয়ে ঘিরেও এগিয়ে চলে সব আয়োজন।
 
১৪ জুন সন্ধ্যায় প্রথমবারের মতো পুরো পদ্মাসেতু আলোকিত হয়। ১৭ জুন সন্ধ্যায় সাভারের বাড়িতে হাসানের গায়ে হলুদ হয়। 

হাসানের গায়ে হলুদের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে ঘনিষ্ঠজন সজীব মিয়া লিখেছেন, ‘পদ্মাসেতুতে যতদিন পাবলিক পরিবহন না চলছে, ততদিন কবুল না বলার সিদ্ধান্তে অটল ছিল হাসান ভাই। পদ্মাসেতুর আলো জ্বলেছে, এবার আলো জ্বলল হাসান ভাইয়ের হলুদ-সন্ধ্যার!’ 

তৃমার গায়ে হলুদ হবে ২৪ জুন, ঢাকায়। সে জন্য এখন চলছে প্রস্তুতি। এই প্রস্তুতির মধ্যেই ২১ জুন বিকেলে হাসান তাঁর ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। পোস্টে লিখেছেন, ‘স্বপ্নের পদ্মাসেতু উদ্বোধন উপলক্ষে ২৫ জুন বিয়ের পরিকল্পনা করেছি। সবার আশির্বাদ প্রত্যাশা করছি।’ 

ফেসবুক পোস্টে বিয়ের কার্ড জুড়ে দিয়েছেন হাসান। কার্ডে বিয়ের তারিখ উল্লেখ রয়েছে ২৫ জুন । বিবাহোত্তর সংবর্ধনা ১ জুলাই। 

কার্ডের বাম দিকে একটি হাতে আঁকা চিত্রকর্ম রয়েছে। গ্রামীণ পরিবেশে বিয়ের এই চিত্রকর্মটি এঁকেছেন তৃমা।

কার্ডে লেখা রয়েছে, ‘আমাদের এই যৌথ জীবনের জন্য শুধু মাত্র আশীর্বাদ ও ভালোবাসা কাম্য।’ 
বিয়ের কার্ডের নিচের অংশের ওপাশ-ওপাশজুড়ে রয়েছে পদ্মাসেতুর প্রতীকী অলঙ্করণ। 

হাসান বলেন, ‘বিয়ের কার্ডের ধারণাটি আমার। একটা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কার্ড করিয়েছি। ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ি ব্যবহার করেছি কার্ডে। পদ্মাসেতু উদ্ধোধনের দিনকে কেন্দ্র করে আমাদের বিয়ের পরিকল্পনা। তাই কার্ডে পদ্মাসেতুর প্রতীকী রাখা হয়েছে। এই সেতু পদ্মার দুই পাড়কে যেমন যুক্ত করেছে, তেমনি আমাদের দুজনের জীবনও বিয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সেতু বন্ধন হবে। এই কার্ড সংযোগের বার্তা দেয়।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্য প্রযুক্তিতে স্নাতকোত্তর করছেন হাসান। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। সংগঠনপ্রেমী হাসান বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ছিলেন প্রথম আলো বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে পড়ালেখা শেষ করে তৃমা একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত। তার শখ পেইন্টিং ও ফটোগ্রাফি।

হাসান জানালেন, পারিবারিক পর্যায়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা যখন শুরু হয়, তখন থেকে প্রথার বাইরে দারুণ কিছু করার চেষ্টা করে আসছেন তিনি। তাঁর পরিবারের কেউ মেয়ে দেখতে যায়নি। উল্টো তাঁকে দেখতে মেয়ের পরিবার আসে। বিবাহোত্তর সংবর্ধনা মেয়ের বাড়িতেই আয়োজন করা হয়েছে। বিয়েতে বর-কনের সাজে চাকচিক্য থাকবে না। অতিথিদের কাছে শুধু আশীর্বাদ কামনা করা হবে। 

তৃমা বলেন, ‘পদ্মাসেতু সংযোগের মাধ্যম। এই সেতু সাহস, দৃঢ়তা, বিজয়ের প্রতীক। আমাদের প্রেম থেকে পরিণয়ের দীর্ঘ যাত্রা পদ্মাসেতুর মতো সাহস-দৃঢ়তা-বিজয়েরই আখ্যান বলে।’