শুক্রবার, অক্টোবর ১৫, ২০২১
কোয়ারেন্টাইনে আত্মকথন ।। অনুপমা চক্রবর্ত্তী

কোয়ারেন্টাইনে আত্মকথন ।। অনুপমা চক্রবর্ত্তী

টিএনএন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : August 24, 2021 | শিল্প ও সাহিত্য

এক কঠিন ক্রান্তিকাল পার করছি আমরা। বলা যেতে পারে, আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এটিই সবচেয়ে বড় সংকট, যেখানে মানব সভ্যতা বৈশ্বিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে মুখ থুবড়ে পড়েছে। কোভিড-১৯ সংক্রমণের এই দুঃসহনীয় পরিস্থিতি জীবনের প্রতিটি মূহুর্তকে শুধু ক্রমশ বিপর্যস্ত করে তুলছে না, জনজীবনে পরিবর্তন শব্দটাকেও যেন এক অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তিকর ব্যাধিতে পরিণত করেছে। করোনার বিস্তার ঠেকাতে লকডাউন বাধ্যতামূলক; যেহেতু ধৈর্য সহকারে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে সচেতনতা পালন করা ছাড়া আমাদের কাছে আর কোন পথ নেই এমনকি বিশ্বের বহু উন্নত দেশ একইভাবে সংক্রমণ এড়াতে অগ্রসর হয়েও নিত্য হিমশিম খাচ্ছে। এক্ষেত্রে জীবনের অস্তিত্ব রক্ষায় একদিকে নিজের সুরক্ষা যেমন জরুরি তেমনি অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী এই মহামারির সাথে যুদ্ধটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর সে কারণেই, এ হোম কোয়ারেন্টাইন।

তবে এ অবস্থায় এতো দীর্ঘ সময় বাসায় থাকা নিঃসন্দেহে বেশ কঠিন একটা অধ্যায়ের জন্ম দেয়। আমরা যেহেতু অধিকাংশ মানুষ ঘরে-বাইরে মিশ্র কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি তাই অভ্যাসগত কারণে এ কোয়ারেন্টাইন আমাদের কাছে গৃহবন্দী হতে কারাবন্দী - এর কোনটাই, উপলব্ধিতে সীমা টানতে পারছে না। নিজ বাসস্থানে থেকেও যেন আমরা আজ চরম অসহায়। অনবরত নীরবতা, স্থবিরতা আমাদের গ্রাস করছে। এটা ঠিক যে প্রয়োজনের তাগিদে যেকোন পরিস্থিতি আমাদের জীবনে পরিবর্তনকে স্বাগত জানায়। যদিও এবার কিছুটা বাধ্য হয়ে, তারপরও এখানে মন খারাপের কোন সুযোগ নেই। প্রকৃতি যেমন তার অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্যোগ স্থির থেকে বুকে আগলায় আমাদেরও উচিত ধৈর্য সহকারে এ কঠিন বাস্তবতার মোকাবিলা করা। আর তাই এ দুঃসময়ে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে অধিক গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন; সেক্ষেত্রে নিজ নিজ বাসায় শান্তি এবং আরাম খুঁজে নিতে পারলে মনোভুবনে একটা ইতিবাচক প্রভাবের বিস্তার ঘটবে।

প্রসঙ্গত, কোয়ারেন্টাইনের সময়গুলো অনেকভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে যেখানে উৎপাদনশীল, বিনোদনমূলক ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ আরো নানাবিধ উন্নয়নমূলক চিন্তাভাবনা ব্যস্ততা আনতে সক্ষম। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রত্যেকের নিজ নিজ শরীরের প্রতি অধিক যত্নশীল হওয়া। উল্লেখ্য যে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে দ্রুত প্রতিহত করা যায়। তাই এ মহামারি মোকাবিলায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো একান্ত অপরিহার্য। এ বিষয়ে শরীর গঠনে পানিসহ নানাবিধ ভিটামিনের সুষম যোগান আমরা বাসায় থেকে সুপরিকল্পিতভাবে দিতে পারি। ভিটামিন-ই শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা সংক্রমণের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে; শরীরের ইমিউন সিস্টেমে বায়োকেমিক্যাল রিঅ্যাকশন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন বি৬; আর ভিটামিনের তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে নেয়া ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় সবসময়ই অন্যতম। সুতরাং, এসকল ভিটামিনের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ইমিউন সিস্টেমকে মজবুত করে তুলতে প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকায় কালোজিরা, মধু, আপেল, পেয়ারা, কলা, লেবু, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও সবুজ শাকসবজিসহ আরো নানাজাতের খাবারের ব্যবস্থাপনা খুববেশি শ্রমসাধ্য নয় যেখানে এক অফুরন্ত সময় আমাদের মনকে ক্লান্তিহীনভাবে উচাটন করে তুলছে। মনে রাখা জরুরি, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল; তবে, সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যের সমন্বয়টাও বিশেষভাবে প্রয়োজন।

 

স্পষ্টত, ধনী-গরিবের মাঝে কিছু ছন্দপতন থাকলেও আমাদের প্রত্যেকের জীবনে গল্প আছে এবং তা অবশ্যই উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টায় সংগ্রামের গল্প। তবে প্রত্যেক গল্পেই প্রাচুর্যতা লক্ষণীয় যেখানে সম্পত্তির মাঝে আত্মার শান্তি মেলে অনায়াসে। জীবনের গল্প নিয়ে যখন এতো কথা তখন বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে কোয়ারেন্টাইন হোক ব্যক্তিজীবনে করোনা সংগ্রামের এক নতুন গল্প; যেখানে জয়ের পথ সুনিশ্চিত করতে নিজেকে ইতিবাচক রাখা এবং আত্মবিশ্বাসী মনোভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই মুখ্য।
যুদ্ধ যখন ঘরের বাইরে তখন ঘরের ভেতরে শান্তি স্থাপন করা খুব দরকার। মনে রাখা জরুরি, যেকোন বিপর্যয় মানসিক বিপর্যয়ের জোয়ার তুলে; তাই, বাড়িতে দীর্ঘ সহাবস্থান কোনভাবেই যেন উদ্বেগপূর্ণ পরিস্থিতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায় সেদিকে নজর রাখতে হবে। আমরা সবাই জীবনে একই সংগ্রামে আছি, পরিবারের সকলের প্রতি সহমর্মিতা প্রদানসহ আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টা অবশ্যই যেখানে ভাবতে হবে। সেক্ষেত্রে সোস্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত না করে শরীর গঠনের পাশাপাশি বাসার কাজগুলো পরিবারের সদস্যদের সাথে ভাগ করে নেয়া শ্রেয়। তাছাড়া আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এমন অনেক কাজ থাকে যার জন্য সময় বের করা প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে, এ সময়ে সুপরিকল্পিতভাবে সেগুলো শুরু করা যায়; অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রায়শ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একটা অপরিচ্ছন্ন ভাব নিয়ে আসে, কোয়ারেন্টাইনের বদ্ধ জীবনের একঘেয়ামিভাব কাঁটাতে প্রয়োজনীয়তার বাইরের জিনিসগুলো ছাঁটাই করে সবকিছুর একটু স্থান পরিবর্তন ঘরের অনেকটা শোভা বর্ধন করে, এক্ষেত্রে ঘরের পরিবেশে নতুন জীবন আনয়নে সবুজায়নও একটা অতুলনীয় মাধ্যম বলা চলে; যা গাছপালা ও হরেক ফুলের সবুজ আচ্ছাদনে মন সতেজ রাখার পাশাপাশি করোনা সংকটে অতি প্রয়োজনীয় উপাদান অক্সিজেন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, অতএব এ গাছপালাগুলো সজীব ও সতেজ রাখার দায়িত্বটা এ বদ্ধ সময়ে সহজেই অন্তর্ভূক্ত করা যায়। সাম্প্রতিক আরেকটি বিষয় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে, প্রযুক্তির সুফলে অনেকে হয়তো ঘরে বসে অফিশিয়াল কাজে ব্যস্ত, কেউবা শিক্ষার্থী হয়ে অনলাইন ক্লাসে বসেছে কিন্তু যারা ইচ্ছা অনিচ্ছায় এখনো হাতেকলমে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সাথে সুসম্পর্ক জুড়ে বসতে পারেনি তাদের জন্য এটা সুবর্ণ সুযোগ; জীবনে এমন অনেক শখ বা প্রয়োজন আছে যা সময়ের প্রশ্নে আটকে যায় এর মধ্যে যার অনেককিছু করা সম্ভব, যেমন- অনলাইনে কিছু কোর্স করলে সময়ের সদ্ব্যবহারসহ নিজের নামে ই-সার্টিফিকেট অর্জন অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক হবে।

আরো একটি জরুরি ব্যাপার হচ্ছে, কোভিড-১৯ প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, যেটা কাজের উৎপাদন বাড়াতেও সহায়ক হয়। নিত্য ব্যবহার্য পণ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থান এবং জিনিসপত্র পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অত্যন্ত সর্তকতার সাথে দৈনিক তদারকি প্রয়োজন।

সর্বশেষে একটাই প্রত্যাশা - সময়ের সঠিক প্রয়োগে দৈনন্দিন জীবনে কঠোর দায়বদ্ধতা উত্তরণ করে আত্ম উপভোগের মাধ্যমে কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলো সফল করা এবং মহামারি মোকাবিলায় সূদুরপ্রসারী যুদ্ধে সম্মিলিত আহ্বানের ডাক - আমরা করবো জয়!