শুক্রবার, অক্টোবর ১৫, ২০২১
নৌযান ও নৌপথে নৈরাজ্য

নৌযান ও নৌপথে নৈরাজ্য

টিএনএন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : August 24, 2021 | সম্পাদকীয়

নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ নিশ্চিত করুন

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যে নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না, তার জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া গেল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) পরিচালিত ফেরির সনদ নবায়নে। গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির মালিকানাধীন ৫৩ ফেরির ৪৭টিরই ফিটনেস সনদ নেই। নৌযান পরিদর্শন, নিবন্ধন ও ফিটনেস দেখভালের কাজ করে নৌপরিবহন অধিদপ্তর। সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তারাও এ ব্যাপারে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। সম্প্রতি পদ্মা সেতুর পিলারে পরপর চারটি ফেরি ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল অধ্যাদেশ (১৯৭৬) অনুযায়ী, দেশের নৌপথে কোনো নৌযান ৪০ বছর পর্যন্ত চলাচল করতে পারে। শুরুতে নিবন্ধনের মেয়াদ হয় ৩০ বছর। এরপর বিশেষ জরিপ করে চলাচলের উপযোগী পাওয়া গেলে পাঁচ বছর করে দুই দফায় ১০ বছর মেয়াদ বাড়ানো যায়। অথচ আমাদের নৌপথে ৯৫ বছর বয়সী ফেরিও চলাচল করছে। মাদারীপুরের বাংলাবাজার থেকে মুন্সিগঞ্জের শিমুলিয়া রুটে চলাচল করে ১৯২৫ সালে নির্মিত পাঁচটি ডাম্ব ফেরি। এই ফেরিতে ইঞ্জিন থাকে না, ইঞ্জিনবাহী আরেকটি নৌযান বা টাগবোট এটিকে চালিয়ে নিয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে প্রমত্ত পদ্মায় পারাপার করা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। দেশে বর্তমানে ছয়টি রুটে ফেরি চলে—শিমুলিয়া-বাংলাবাজার, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া, আরিচা-কাজীরহাট, চাঁদপুর-শরীয়তপুর, লাহারহাট-ভেদুরিয়া এবং ভোলা-লক্ষ্মীপুর। নৌপরিবহন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময় ২৩টি ফেরির ফিটনেস সনদ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এখন ছয়টির ফিটনেস সনদের মেয়াদ আছে। বাকিগুলোর নেই।

 

প্রথম আলোর খবরে আরও বলা হয়, পদ্মা সেতুর পিলারে যে চারটি ফেরি ধাক্কা দিয়েছিল, তার একটিরও হালনাগাদ ‘ফিটনেস’ সনদ নেই। আইন অনুযায়ী ফেরি দুটির মেয়াদকাল পেরিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য হলো, ফিটনেস পরীক্ষা করা হলে ফেরিতে কী কী সমস্যা আছে, সেগুলো ধরা পড়ে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান বলেছেন, ফেরিগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ক্ল্যাসিফিকেশন সোসাইটিজের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা এবং ৪০ বছরের পরও মজবুত থাকে। তঁার এ বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। মেয়াদের পরও যদি ফেরি মজবুত থাকে, তাহলে ফিটনেস সনদ নিতে আপত্তি কোথায়?

নৌপথে কেবল ফিটনেসবিহীন ফেরি চলাচল করছে না; যেসব লঞ্চ, স্টিমার, বাল্কহেডসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী যান চলাচল করছে, সেগুলোরও অধিকাংশের ফিটনেস সনদ নেই বলে অভিযোগ আছে। গত ৪ এপ্রিল শীতলক্ষ্যায় যে কার্গোজাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে লঞ্চ ডুবে ৩৪ জন যাত্রী মারা যান, সেই কার্গোজাহাজেরও ফিটনেস সনদ ছিল না। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে সনদপ্রাপ্ত নৌযানের সংখ্যা ১৩ হাজার ৪৮৬। এর মধ্যে ২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে গত ৩০ জুন পর্যন্ত নবায়ন করেছে মাত্র ৮ হাজার। কিন্তু নৌপথে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানের সংখ্যা অনেক বেশি। নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ ছাড়া এসব নৌযান কীভাবে চলাচল করছে, তার জবাব কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। নৌপথে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই সংশ্লিষ্টরা কিছুটা নড়েচড়ে বসেন। এরপর সবকিছু আগের মতো চলতে থাকে। নৌপথের এ নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে। সব নৌযানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে যাঁরা জবাবদিহি আদায় করবেন, আগে তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।