শুক্রবার, অক্টোবর ১৫, ২০২১

টিএনএন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : September 02, 2021 | শিল্প ও সাহিত্য

লোকে আমাকে পাগল বলে- নচিকেতা

আমার মতো বেহিসাবি, বোহেমিয়ান একটা মানুষের জন্মদিন সেলিব্রেট করা হচ্ছে। তা নিয়ে যখন লেখার বরাত পেলাম একটু অস্বস্তিই হচ্ছিল। কী লিখব? মাথা চুলকেও যখন রাস্তা পাচ্ছি না, তখন হঠাৎ করেই বদ বুদ্ধিটা চাগাড় দিল। লেখাটা বরং মৃত্যু দিয়ে শুরু করি। সংস্কৃতি প্রিয় বাঙালির হয়তো এতেও ভ্রু কুঁচকে যাবে। জন্মদিনের লেখার আলাপে মৃত্যু! এ কেমন চ্যাংরামো! এটাই তো আমি। আমার বকলেসহীন জীবনই জিন্দাবাদ। যাই হোক এবার স্থায়ীতে আসি। হঠাৎই মনে হল, আমি মরে গেলে এপিটাফে যেন লেখা হয়, 'প্রলাপ'। কারও কারও মতে, আমি তো প্রলাপই বকেছি। অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে অদ্ভুত দিক তুলে ধরি তো, তাই ওটার নাম সারকাস্টটিক্যালি প্রলাপই রাখব। দেখতে দেখতে কেটে গেল জীবনের ৫৬টা বসন্ত। এখন কেয়ার অফ ফুটপাত থেকে প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ভাবি কতটা বদলেছে নচি। আমার আমিটা উত্তর দেয়, আজও ভবঘুরেই হতে চায় সে। সামাজিক বন্ধনে জড়িয়ে পড়লেও মনে মনে আজও নচি সেই পাগলা জগাই। এখনও ট্রাকের মাথায় চেপে মন বলে যাই যাই। তবুও কোথাও যেন আমি আর সেই নচি নেই। এখন ভোরবেলা উঠি। আমার সঙ্গে এখন ডিনার ডেটে যাওয়াই যায়। আজ আর চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শোনাই না। কোনও কিছু ভালো না লাগলে একটু গুছিয়ে বলি, ঠিক তেমন ভালো হল না। নচিকেতা আসলে একটু ভীতু হয়ে গিয়েছে। এখন দৌড়ে, লাফিয়ে বাস ধরতে ভয় লাগে। লোকের সঙ্গে ঝগড়া করতে কষ্ট হয়। অনুভূতিগুলো বদলাচ্ছে। আজকাল কাউকে আঘাত করতেও ভালো লাগে না। একসময়ের ঘোরতর নাস্তিক আমি এখন অদৃষ্টবাদে বিশ্বাসী। প্রাইভেট মার্কসিস্ট সেই আমি আজ উপরের লোকটাকে ডরায়। ১২ বছর আগের সেই ভীষণ অসুস্থতাই হয়তো এই পরিবর্তনের কারণ। সেখান থেকে ফিরে আসার পর বুঝলাম, আমার হাতে কিচ্ছু নেই। অন্য কোনও চালিকাশক্তি আমায় দিয়ে হয়তো আরও কিছু করাতে চায়, তাই ফিরিয়ে আনল। সেদিনের নচি তাই আজ অন্তবিহীন পথের ললাট লিখনে বিশ্বাসী। সেদিন পীযূষকান্তি সরকারের সঙ্গে পাইকপাড়ার মোড়ে দেখা হওয়াটাও ছিল ডেস্টিনি। ওঁর হাত ধরেই মিউজিক আমার হাত ধরবে তাও আগে থেকেই লেখা ছিল। আজ অনির্বাণের সঙ্গে দেখা হলে পৃথিবীটা কী করে বদলানো যায় সেই নিয়ে হয়ত আলোচনা করতাম।

 

এত বছর পর ও লড়ছে ওর মতো, আমিও আমার জায়গায় লড়ছি। কিন্তু ৫৬ বছর কাটিয়ে ফেলেও ভাবি পৃথিবীটা আর বদলাল না! আগেও ছিল যে শোষণ আজও তাই আছে। শুধু তার ধারা, মাধ্যম বদলেছে। বরাবর শোষণের বিরুদ্ধেই আওয়াজ তুলে এসেছি। রাস্তায় নেমে বদলেছি সরকার। আমাদের হাত ধরেই তো ক্ষমতায় এসেছিল পরিবর্তনের সরকার। এত বছর পরে রাজনৈতিক মঞ্চে দেখে অনেকের মনেই অনেক প্রশ্ন জেগেছিল। কিন্তু এবারে রাস্তায় নেমেছিলাম একটা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আটকাতে। ধর্মকে কেন্দ্র করে যারা রাজনীতি করতে এসেছে তাদের আটকানোটা খুব দরকার। এই বিভেদের রাজনীতিটা শুরু হতেই আমাকে পথে নামতে হল। আপাতত তাদের আটকানো গেলেও আরও বড় মাপের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাতে হয়তো দেশজুড়ে বড় বড় মানুষ, বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আমিও যোগ দিতে পারি। তবে সক্রিয় রাজনীতিতে কখনও আসব না। আসলে আমি নিজের শর্তে চলা একটা লোক, বেপরোয়া মানুষ। আমি উচিত-অনুচিতের ঊর্ধ্বে। তাই সক্রিয় রাজনীতি আমার জন্য নয়। তবে আমি থাকব। প্রতিবছর জন্মদিনে একটা বিশেষ শুভেচ্ছাবার্তা আসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে। মমতাদির সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অন্যরকম। ও আমার দিদি। আমার কেরিয়ার-জার্নি নিয়ে গুচ্ছ গুচ্ছ নিউজপ্রিন্ট আর এয়ার টাইম নষ্ট হয়েছে। মানুষ মনে রেখেছে। এখনও আমার গান বাজনা নিয়ে চর্চা হয়, স্বাভাবিকভাবেই এসব দেখে ভালোই লাগে। তবে লোকে তো আমার গান ভালো করে শুনলই না। মানুষের কাছে পৌঁছনোর তাগিদ থেকেই ধ্রুপদ ছেড়ে 'বিপদ' ঘরানায় আমার আসা। ভিতরে ভিতরে বরাবরই একটা শোষণ বিরোধী সত্ত্বা কাজ করত, তারই বিস্ফোরণ আমার কলমে। তবে বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা আমাকে কবি

বলে মনেই করে না। বুদ্ধিজীবীদের একটা সমস্যা আছে। তারা রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কাউকেই কবি হিসেবে দেখে না। তাও রবীন্দ্রনাথ নোবেলখানা পেয়েছিলেন বলে জাতে উঠলেন। নোবেল পুরস্কার না পেলে তাঁকে দিয়ে হয়তো সিরিয়াল লেখাত। জনপ্রিয় লোকজনকে নিজেদের সমগোত্রীয় ভাবতে ধুতি-পাঞ্জাবিদের আঁতে লাগে। পপুলার আবার কী! চাকরবাকর গোত্রের ভাবে আর কী। ওর ড্রাইভারের আমার গান ভালো লাগলে, ওর আমার গান ভালো লাগতে পারে না। আসলে সবকিছুতে ওদের একটা শ্রেণীবৈষম্য আছে। টাকার মতো গানের ক্ষেত্রেও তা কাজ করে। আমার গান রিক্সাওয়ালা থেকে বেকার ছেলে পছন্দ করলে তিনি কী করে সেই গান ভালো বলবেন। তাহলে তার আর রিক্সাওয়ালার মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকে না। সেই ভয়ই পায় ওরা। আসলে এদের প্রকৃত শিক্ষাদীক্ষা বলে কিছুই নেই। আমার কোনও রিগ্রেট নেই। যা লিখেছি বেশ করেছি। যা করেছি বেশ করেছি। এই কোভিডের কঠিন সময়েও 'ও ডাক্তার' গাইতে আমার কোনও অসুবিধে হয় না। কারণ আমি জানি, রোগীর সেবা করে মৃত্যু বরণ করা ডাক্তারও যেমন আছে তেমনই মানুষের সেবার নামে ব্যবসা করা ডাক্তারও এই দুনিয়াতেই আছে। যাদের নিয়ে লিখেছিলাম তারা আজও করে খাচ্ছে। তাই আমার কোনও কিছুতেই কিন্তু কিন্তু নেই।

জীবনে পুরস্কার নিয়েও আমার কোনও আক্ষেপ নেই। কারণ, স্বয়ং চার্লি চ্যাপলিনও সারা জীবনে কোনও পুরস্কার পাননি। মৃত্যুর পর অস্কার কর্তারা নিজেদের বাঁচাতে, লজ্জায় তাঁকে দিয়েছিল 'লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট'। পুরস্কার ঘোষণার পর সেদিন গোটা হল উঠে দাঁড়িয়ে টানা ১৮ মিনিট হাততালি দিয়েছিল। পৃথিবীতে আর কেউ এমন সম্মান পাননি। আসলে যে ইনস্টিটিউশনগুলো পুরস্কার দেয় তারা সব ভণ্ড, ধাপ্পাবাজ। চার্লি চ্যাপলিনের উদাহরণই গোটা দুনিয়ার সেই ভণ্ডদের মুখোশ খুলে দিয়েছিল। চার্লি চ্যাপলিনের মতো আমার ক্ষেত্রেও কিছু একটা হবে। আসলে আমি এমন পুরস্কার চাই না। মানুষ আমাকে মনে রেখেছে এটাই আমার কাছে সবথেকে বড় প্রাপ্তি। অনেকেই আমার গান-গায়কির সঙ্গে এখনকার গানবাজনার তুলনা করেন। তা মারাত্মক ভুল। যে আর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থানের মিশেলে আমার উত্থান, তাকে বিশ্লেষণ করার মতো কোনও মেধা এখনকার সুরকার-গীতিকারের মধ্যে নেই। এখন লোকে গান তৈরির আগে ঠিক করে কোথায় রেকর্ড করব। গিটার নেব না কি-বোর্ড। আরে আগে গান ঠিক কর! শুধু গান নয়, সিনেমার ক্ষেত্রেও তাই। সত্যজিৎ রায় একটা ভাঙা ক্যামেরা নিয়ে 'পথের পাঁচালি' শ্যুট করেছিলেন। আর এখন যারা সিনেমা বানায় তারা সাহিত্যের কিছু জানেই না, কিন্তু তাদের টেকনিক্যাল জ্ঞান প্রচুর। আসলে গোটা দুনিয়া কনজিউমারিজমের দাস হলে তো এই হবে। কল্পনা শক্তি কমে যাচ্ছে। এখন একটা কথা বোঝাতে গেলেই তাকে ২০ খানা লাইন লিখতে হচ্ছে। অথচ এই বাংলাতেই 'আমারও পরাণও যাহা চায়...' বলেই সবটা বলে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রেমবোধের ধারণা শিল্পী থেকে সাধারণ মানুষ কারও নেই। প্রেম এখন বদলে গিয়েছে। প্রেম এখন ইউনিক ফিগার। এখন এই সম্পর্কে গেলে আমার কী কী লাভ হবে তা ছকে লোকে প্রেমে পড়ে। প্রেম বলতে যে দুঃখবোধ, যন্ত্রণা আছে তা আর কেউ বোঝে না। এখন কেউ বিষাদের কথা বলে না, বিরহের গান শোনে না। সর্বক্ষণ সবাই নাচছে। খাট, লোভ কর, ভোগ কর আর নাচ। কনজিউমারিজমের এই ধারণাতেই এখন দুনিয়া চলছে। ভোগবাদ আমাদের সভ্যতাকেও নষ্ট করে দিচ্ছে। তবু নচির জীবনে এখনও প্রেম আসে। আমারই লেখা গানের কথায় বলি, 'আমার নেই কোনও শাসন, ভালোবাসি যখন তখন...।' আমার কাছে প্রেম একটা কনফিউশনের জায়গা। আমার কাছে প্রেম অনেক শেডের মিশেল। লোকে আমাকে পাগল বলে। প্রেম আমার কাছে কখনও 'পিটুইটারির খেলা', কখনও আমিই বলেছি, 'এই তুমি কি আমায় ভালোবাস?' আমার কাছে প্রেম কখনও নীলাঞ্জনা, কখনও রাজশ্রী। আমার কাছে প্রেম মানে তুমি আর আমি, চল গিয়ে হোটেলে খাই, শাড়ি কিনি-এই মিষ্টি মিষ্টি ব্যাপারটা নয়। প্রেম আসলে জীবনের গতি। জীবনজুড়েই প্রেম থাকে। ভালোবাসা মানেই হাত ধরা নয়। শ্রদ্ধাই আসলে অন্যভাবে দেখতে গেলে প্রেম। তা নিয়েই বেঁচে আছি। প্রেমই হয়তো বাঁচিয়ে রেখেছে। আর রেখেছে জীবনের সেরা গানটা লেখার খিদে। কারণ, ওটাও এখনও লেখা হয়নি।